জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আমাদের সবারই জানা উচিত। জ্বর এমনই একটা রোগ যা যে কোনো সময় যে কারো হতে পারে। সবচেয়ে যেটা লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে জ্বর কোনো একটি বা দুটি কারণে হয় না যে, আমরা তার প্রতিষেধকের ব্যবস্থা করব বা সচেতন থাকব। বিভিন্ন কারণে মানুষের জ্বর হতে পারে।
কোনো মানুষ রাতে বাড়ি ফিরল। সকালে যখন উঠলো তখন তাঁর গা ব্যথা, মাথা ভার, সর্দি, সেই সঙ্গে গায়ে জ্বর। আপনার বাচ্চারা খেলতে খেলতে শরীরে হয়ত কোথাও চোট পেল, তা থেকে পরদিন তার জ্বর আসতে পারে। বাড়ির গৃহিণী হয়ত আজ ভালোই আছে কাল হঠাৎ সকালে বিছানা থেকে উঠতেই পারল না কিংবা রান্না করতে করতেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। শোওয়ার পর জ্বর।

জ্বর কিভাবে হয়?
জ্বর বিভিন্ন রোগের উপসর্গ হিসেবে, চোট লেগে, ঠান্ডা লেগে, এমন কি ভয়ে, টেনশনে, আতঙ্কে পর্যন্ত জ্বর আসতে পারে। ইদানীং তাই জ্বর কমানোর জন্য বাজারে নানরকম ওষুধও বেরিয়েছে যা খেলে জ্বর ছেড়ে যায় বা তখনকার মতো সাময়িক রেহাই পাওয়া যায়। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে জ্বর এক-একসময় এমন বেমক্কা সময়ে চলে আসে যে তখন স্বাভাবিক কারণেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় না। হাতের কাছে ওষুধ বা ওষুধের দোকানও পাওয়া যায় না। অথচ হাতের কাছেই পাওয়া যায় এমন কিছু কিছু জিনিস এবং তার উপকারিতা সম্বন্ধে আমাদের জানা থাকলে রোগীর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করা যায়।
তবে পাশাপাশি একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, জ্বর সবসময় যে শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক তা কিন্তু নয়। অনেক সময় জ্বর আমাদের সহায়কের ভূমিকাও পালন করে।
আরও পড়ুন- স্বাস্থ্য ভালো রাখার কয়েকটি সহজ উপায়
জ্বর হলে কি হয়?
আমরা জানি আমাদের অর্থাৎ মানব শরীরে এণ্টিবডিজ বলে একটা কথা আছে। এই এণ্টিবডিজ আমাদের শরীরের রোগ-জীবাণুর সঙ্গে এমনকি বাইরের নান ধরনের রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শরীরের যে সুরক্ষা ব্যবস্থা এন্টিবডিজ তাকে বহাল রাখে। এই এণ্টিবডিজ যখন গরমে উত্তেজিত হয়ে পড়ে, যেমন জ্বরের সময় হয়, তখন তা অনেক পরিমাণে বেড়ে যায়। পরিণামস্বরূপ শরীরের সুরক্ষা ব্যবস্থাকেও আরও জোরদার করে ফেলে। শরীর গরম হলে শরীরের প্রভাবিত অংশে রক্ত বেশি আসে, সঙ্গে সঙ্গে এণ্টিবডিজও চলে আসে। আর তা অর্থাৎ এই প্রতিক্রিয়া শরীরের জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করতে বা তাকে সমূলে নষ্ট করতে সাহায্য করে। জীবাণু সুযোগ পেলে শরীরের অংশ বিশেষে বা প্রভাবিত অংশে বেড়ে ওঠার চেষ্টা করে সেক্ষেত্রে এণ্টিবডিজ জনিত প্রতিরোধক ব্যবস্থা কমে যায় বা জীবাণুর শক্তি এণ্টিবডিজকে পরাস্ত করে, তখন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে।
আরও সহজ করে বললে বলতে হয় মানুষের শরীরের প্রতিরোধক ব্যবস্থা যদি কমে যায় এবং স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে তাহলেই মানুষ রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে তার রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা যদি ঠিক থাকে, শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক থাকে তাহলে তার জ্বর হয় না বললেই চলে বা হলেও খুব কম সময়ের জন্য হয়।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে শরীরকে সুস্থ রাখার মূলমন্ত্র হচ্ছে তার প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে ঠিক রাখা। এই প্রতিরোধক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেই জীবাণুরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং তাদের সঙ্গে লড়াই করতে বা সেগুলোকে নষ্ট করতে বেশ সময় লাগে।
আবার এভাবে নষ্ট করার কিছু মন্দ দিকও আছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা জ্বরের চিকিৎসার জন্য রোগীকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধ দিতে হয়, যাতে উক্ত রোগের জীবাণুকে ঐ ওষুধ ধীরে ধীরে সমূলে বিনাশ করতে পারে এবং একসময় জীবাণু নষ্টও হয়ে যায়, জ্বরও কমে যায় কিন্তু ক্ষতিকারক দিক যেটা তা হলো এই দীর্ঘ লড়াইয়ে অর্থাৎ ওষুধের ক্রিয়ায়-বিক্রিয়ায় মানুষের শরীরের এণ্টিবডিজকেও নষ্ট করে দেয়।
আর এই এণ্টিবডিজকে নষ্ট করে দেওয়ার বা কম করে দেওয়ার অর্থ হলো শরীরের প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া। এতে রোগীর শরীর-স্বাস্থ্যও দুর্বল এবং কমজোরি হয়ে যায়।
জ্বর হলে কি খাওয়া উচিত?
শরীরের জ্বরের ভূমিকা প্রায়শঃই ক্ষতিকারক হয় না। বিশেষ করে এই ভূমিকা হয় জীবাণুর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য। কারণ তা জীবাণুর আক্রমণে বা কোনো কারণে ফুলে যাওয়ার জন্য বা ফোড়া ইত্যাদি হওয়ার জন্য শরীরে যে টক্সিস বা বিষ পদার্থ উৎপন্ন হয় তাকে বাইরে বের করে দেয়। আর যেহেতু এ সময়ে শরীরের যাবতীয় শক্তি এই বিষ পদার্থকে বাইরে বের করে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত থাকে তাই শক্ত বা ভারি খাবার এসময়ে চট করে হজম হয় না। ফলে এ সময়ে সহজপাচ্য খাবার বা পানীয় দেওয়ার বেশি প্রয়োজন হয়। গুরুপাক আহার এ সময়ে পাচনতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করে। সুতরাং যতটা সম্ভব সহজপাচ্য খাবার ও পানীয় বেশি করে দিতে হবে। এতে একদিকে শরীরের পাচনতন্ত্রের কাজ যেমন অব্যাহত থাকবে অন্যদিকে জ্বর কমানোর ব্যাপারেও সাহায্য হবে। বিশেষ করে যখন জ্বরের রোগীকে এণ্টিবায়োটিক বা অন্যান্য কড়া-কড়া ওষুধ দেওয়া হয়। তাই আমাদের সবাইকে জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
জ্বর কমানোর ঘরোয়া চিকিৎসা
জীর্ণ জ্বর
চিকিৎসা ঃ সাতটি তুলসী পাতা, চারটে গোলমরিচ, একটি পিপল-তিনটিকে ৬০ গ্রাম জলে ভালো করে বেটে নিয়ে তাতে ১০ গ্রাম মিছরি মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেতে দিন। এতে এক মাসের পুরনো জ্বরও (যাকে জীর্ণ জ্বর বলে) ভালো হয়। প্রয়োজনমতো এভাবে ২-৩ সপ্তাহ সেব করতে দেবেন।
বিবিধ ঃ সকাল-সন্ধ্যে ১-২ কাপ দুধের মধ্যে ২টি ছোট পিপল দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে পিপল তুলে নিয়ে তাতে মিছরি মিশিয়ে রোগীকে খাওয়ালেও জীর্ণ জ্বর ছেড়ে যায়। এতে দুধের মধ্যে পিপলের ঔষধগুণ যুক্ত হয়ে দুধের গুণবত্তা বেড়ে যায়। দুধে লোহার ভাগ কম থাকে তাই তাতে ছোট পিপল দিয়ে ফোটালে দুধে ক্যালসিয়াম ও লোহার মাত্রা বেড়ে যায়।
যে-কোনো ধরনের জ্বরে কার্যকরী যোগ
উপাদান ঃ ১. সুঁঠ, ২. ছোট পিপল, ৩. গোলমরিচ, ৪. সৌন্ধব লবণ, ৫. অজমোদ, ৬. শুকনো পুদিনা, ৭. পিত্ত পাপড়া, ৮. নিম।
চিকিৎসা ঃপ্রতিটি ৬ গ্রাম করে নিয়ে পরিষ্কার করে আলাদ আলাদাভাবে প্রত্যেকটাকে চূর্ণ করে নিন। জ্বরের সময়ে (১০১ ডিগ্রীর বেশি) প্রত্যেকটি সম মাত্রার নিয়ে সেবন করাবেন। জ্বর কম থাকলে ১০১ ডিগ্রী পর্যন্ত হলে নিমের মাত্রা একটু (২/৩ ভাগ) কমিয়ে দেবেন।
কিভাবে সেবন করাবেন ঃ উপরিউক্ত চূর্ণ বড়দের জন্য ৬ গ্রাম (ছোটদের জন্য ৩ গ্রাম) নিয়ে ৬০ গ্রাম পরিমাণ জল ভালো করে বেটে নিন, তারপর এমন তরল বা ঘোল করে নিন যাতে খুব গাঢ় না হয়, পাতলাও না হয়। মনে রাখবেন এই ওষুধ যথ বাটবেন, যত ঘুঁটবেন ততই এর গুণ এবং ক্ষমতা বাড়বে। এই ওষুধ একটা কাঁসার পাত্র গরম করে তার মধ্যে দিন যাতে ওষুধ কিছুটা গরম হয়ে যায়।
এভাবে রোগীকে প্রতিদিন সকালে খালিপেটে এক ঢোঁক করে খেতে দিন। ছোটদের খাওয়ার পর একটু জল দিয়ে দেবন। প্রয়োজনে ঐ ঘোলের মধ্যে সামান্য লবণও দিতে পারে। এভাবে খালি পেটে ৩-৪ দিন খেলে যে-কোনো জ্বর এমন কি এক বছরের পুরনো জ্বরও ভালো হয়ে যায়।
এই ওষুধ সেবনকালে পথ্যের দিকে নজর দেবন। হালকা সুপাচ্য খাবারই দেবেন। এ সময়ে কাচরী না খাওয়ার পরামর্শ দেবন।
জ্বর সর্দি কমানোর ঘরোয়া উপায়-২০২৪
জীর্ণ জ্বর ও কফ জ্বর
যে-কোনো মাটির পাত্রে ১০ গ্রাম যোয়ান এবং ২টি বড় পিপল নিয়ে আট কাপ জলে আট প্রহর ভিজিয়ে রাখুন। সকালে ঐ জলেই যোয়ান ও পিপল ঘুঁটে ঘোল করে নিন। রোজ সকালে এভাবে ঘোল করে পরপর পনের দিন রোগীকে খেতে দিন। এতেও পুরনো বা জীর্ণ জ্বর কমে যায়। কফ জ্বরের এই ঘোল বিশেষ উপকারী।
অন্যবিধি ঃ ১০ গ্রাম যোয়ান মাটির খালি পাত্রে ৫০০ গ্রাম জলে ভিজিয়ে দিনে ছায়ায় ও রাতে শিশিরে খুলে রেখে দিন। পরের দিন সকালে ঐ জল ঘুঁটে রোগীকে খাইয়ে দিন। এভাবে যোয়ানের জল নিয়মিত কয়েকদিন খাওয়ালে কফ জ্বর ভালো হয়ে যায়। এ ছাড়াও এই যোয়ানের জলে পুরনো কোষ্ঠকাঠিন্য, হলুদ প্রস্রাব, হৃদয় বিকার, আমাশয় ও কফজ বিকার এবং পাঁজরের ব্যথা, ফোলা ইত্যাদি কমে যায়।
মনে রাখতে হবে জ্বরের রোগীর ওষুধ যেমন চলবে তেমন তার যত্নও করতে হবে। তার খাওয়া-দাওয়া, ঠান্ডা জলে স্পঞ্জ করা, মাথা ধুইয়ে দেওয়া, জ্বর বাড়লে কপালে জলপটি দেওয়া ইত্যাদির দিকেও নজর দিতে হবে। রোগীকে ঠান্ডা থেকেও সাবধানে রাখতে হবে। বিশেষ করে যেসব জ্বর বারে বারে ঘুরে আসে সে জ্বরের রোগীকে বেশি সাবধানে রাখতে হবে। তাদের ঠান্ডা লাগা মোটোই ভালো নয়।
জ্বর এর একটা কথা প্রসঙ্গতঃ বলে রাখা ভালো, জ্বর কমানোর জন্য ঘরোয়া চিকিৎসায় রোগী সুস্থ না হলে বা তার জ্বর না কমলে যাক্তার বা চিকিৎসাকেন্দ্র যত দূরেই হোক, রোগীকে দেরি না করে সেখানে পাঠাতে হবে।