ভূমিষ্ঠের পর নবজাতকের যত্ন নিয়ে শুরু হয় নতুন চিন্তাভাবনা, শুরু হয় নতুন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জন্মের পর প্রথম সপ্তাহটি কেটে যায় নানা আয়োজনে।
জন্মের পরপরই দেখতে হয় নবজাত শিশুটি স্বাভাবিক কী না
নবজাতকের যত্ন: সাধারণত গর্ভধারণের ৩৮-৪২ সপ্তাহের মধ্যে যে শিশু জন্ম নেয় তাকেই স্বাভাবিক পরিণত শিশু বলে ধরে নেয়া হয়। এ অবস্থায় শিশুর যে সব বৈশিষ্ট্য থাকে সেগুলো হলো :
- ওজন: ২.৭ থেকে ৩.১ কেজি
- দৈর্ঘ্য: ৫০-৫২ সেমি
- মাথার পরিধি: ৩৫ সেমি
- ত্বকের রং গোলাপি
- হৃৎস্পন্দন: ১২০-১৪০/মিনিট
- শরীরের তাপমাত্রা: ১৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কম নয়।
- প্রস্রাব: অল্প পরিমাণে হবে।
- পায়খানা কালচে সবুজাভ।

জন্মের পরপরই তাৎক্ষণিক পরিচর্যা
জন্মের পর পরই শিশুর নাক ও মুখের মধ্যে জমে থাকা নিউকোনিয়াম নামক পিচ্ছিল তরল সাকশান (মেশিনের সাহায্যে আসে) দিয়ে বের করে নিতে হবে। এতে শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসে সুবিধা হবে। শিশুকে পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত সুতি কাপড় দিয়ে জড়িয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রার রুমে রাখতে হবে। হাসপাতালে শিশু জন্য নিলে শিশুচিকিৎসক শিশুর কোনো অনুগত ত্রুটি না তা পরীক্ষা করে দেখেন।
নবজাতকের যত্নে জন্মের পর শিশুর দেহে নিউকোনিয়ামের যে আবরণ লেগে থাকে ত র কর জন্য ‘লিকুইড প্যারাফিন’ নরম কাপড় বা তুলোয় লাগিয়ে আলতোভাবে পুরো শরীর মুছে দিতে হবে। এরপর কুসুম গরম পানিতে শিশুকে গোসল করাতে।
নাভির যত্ন
নবজাতকের যত্নে নাভি সুতা বা ক্লিপ দিয়ে বেঁধে দেয়ার পরও সেখান থেকে রক্তপাত চিকিৎসককে জানাতে হবে। প্রতিদিন নাভির গোড়া রেকটিফায়েড স্পিরিটে ভেজানো তুলো দিয়ে মুছে দেয়া যেতে পারে। তবে এটি না করলেও ক্ষতি নেই। তবে নাভি শুকানোর আগ পর্যন্ত নাভিতে পানি না লাগানোই ভালো। সপ্তাহ দুয়েক মধ্যেই নাভি খসে পড়ে যাবে। তবে এর মধ্যে নাভিতে কোনো পুঁজ জমলে বা দুর্গন্ধ হলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
কাপড় চোপড়
নবজাত শিশুর কাপড়-চোপড় অবশ্যই কোমল ও সুতি হওয়া উচিত। পোশাক ঢিলেঢালা এবং শরীরের নিচের অংশের পরিধেয় বস্ত্র সেলাইবিহীন হলে ভালো। শিশুর কাপড় চোপড় সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে ধোয়ার পর ইস্ত্রি করে নেয়া ভালো। তবে কাপড় ধোয়ার জন্য পানিতে স্যাভলন জাতীয় উপাদান ব্যবহার না করাই ভালো, এতে শিশুর ত্বকে র্যাশ উঠতে পারে।
ঘুম আর ঘুম
নবজাতক শিশু দিনে প্রায় ১৮-২০ ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাটায়। শিশুকে সব সময় কাত করে এবং এপাশ-ওপাশ করে শোয়াতে চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ করে খাওয়ানোর পর এটা অবশ্যই করানো উচিত। এভাবে শোয়ালে শিশু যদি বমি করে তাসহজেই বেরিয়ে আসতে পারে। চিৎ করে শোয়ানো অবস্থায় বমি করলে তা শ্বাসনালীতে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে খাওয়ার ঘন্টাখানেক পর চিৎ করে শোয়ালে কোনো ক্ষতি নেই।
ব্রেস্ট ফিডিং
জন্মের পর পরই শিশুকে বুকের দুধ দিতে হবে। বুকের দুধই শিশুর প্রথম খাবার হওয়া উচিত। জন্মের পর অনেকেই শিশুর মুখে চিনি বা মিছরির পানি কিংবা মধু দিয়ে থাকেন। এটি ঠিক নয়। এতে শিশু সেই সময়ের প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়া শিশুর পরিপাকতন্ত্র মধুর মতো খাবার হজমের উপযুক্ত থাকে না। তাই এতে কিছুটা বিপত্তির ঝুঁকি থাকে।
নবজাতক জন্মের পরপরই বুকের দুধ টানতে চায় না। তাই এ সময়ে ওর মুখে স্তনের বোঁটা দিয়ে চোষানোর চেষ্টা করতে হবে। দুয়েক বার চেষ্টা করলেই শিশু স্তনের বোঁটা চুষতে থাকবে। স্তনের বোঁটা চুষতে থাকলে বুঝতে হবে শিশু বুকের দুধ পাচ্ছে। জন্মের প্রথম দুই-তিন দিন শিশু যে দুধ পায় তার নাম শালদুধ। এই শালদুধ শিশুর জন্য খুবই জরুরি। শালদুধকে বলা হয় শিশুর প্রথম টিকা। কারণ এই শালদুধ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে, শিশুকে কোষ্ঠকাঠিন্য ও জন্ডিস থেকে রক্ষা করে। আর তাই জন্মের পর ৪-৬ ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে বুকের দুধ দেয়া উচিত। ঘুম থেকে জাগার পরই শিশুকে বুকের দুধ দেয়া যেতে পারে। অনেকেই শিশুকে কখন বুকের দুধ দেবেন, কিভাবে দেবেন এ নিয়ে ভাবেন। শিশুকে বুকের দুধ দেয়ার সহজ পদ্ধতি হচ্ছে, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা। অর্থাৎ যখনই ক্ষুধা লাগবে বা ক্ষুধার কারণে কাঁদবে কিংবা দীর্ঘ ঘুমের পর জেগে উঠবে তখনই শিশুকে বুকের দুধ দেয়া সমীচীন । তবে শিশুরা সাধারণত দুই-তিন ঘণ্টা অন্তর খেতে চায়। প্রতিবারের ফিডিং ১০ থেকে ১৫ মিনিটের বেশি হওয়া উচিত নয়। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুর মাথা উপরে রেখে কিংবা কোলে নিয়ে খাওয়াতে হবে। তা না হলে চিৎ করে শুইয়ে খাওয়ানোর ফলে মুখের ভেতর দিয়ে দুধ কানে চলে যেতে পারে এবং কান পেকে যেতে পারে। জন্মের প্রথম দিনটিতে অনেক সময় নানা কারণে নবজাতক পর্যাপ্ত বুকের দুধ নাও পেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে উদগ্রীব হওয়ার কিছু নেই। এ সময়ে অনেকেই উৎকণ্ঠার বশবর্তী হয়ে শিশুর মুখে ফিডারে কৌটার দুধ তুলে দেন। এটি ঠিক নয়। এ সময়ে কৌটার দুধ যদি দিতেই হয় তাও ফিডারে দেয়া যাবে না। চামচে করে দিতে হবে। তাও মাত্র সেই দিনটির জন্য। এ বিষয়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কিছু করা ঠিক হবে না। প্রথম দিন শিশুকে ফিডার দিলে সেই শিশু পরবর্তী সময়ে আর বুকের দুধ টানতে চায় না। কারণ ফিডারের চেয়ে বুকের দুধ টেনে পান করাটা তার কাছে কষ্টসাধ্য মনে হয়। এজনা শিশুকে ফিডারের অভ্যাস না করাই ভালো। এছাড়া ফিডারের জন্য পেটের পীড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বুকের দুধে সেই ধরনের ঝুঁকি নেই বললেই চলে। প্রতিবার শিশুকে দুধ খাওয়ানোর পর, তাকে উপুড় করে কাঁধের ওপর মাথা রেখে পিঠে হালকা চাপড় দিতে হবে। কিছুক্ষণ এভাবে করার পর শিশু ঢেঁকুর তুলবে। ঢেঁকুর তোলার পর শিশুকে শুইয়ে দিতে হবে। এই কাজটি করলে খাওয়ার পর আর শিশু বমি করবে না।
মুখের যত্ন
বুকের দুধ খাওয়ানোর পর দৈনিক দুপুর ও রাতে আঙ্গুলের মাথায় পাতলা সুতি কাপড় পেঁচিয়ে শিশুর মুখের মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে জিহ্বার উপরিভাগ ও ঠোঁটের ভেতরের দিকের অংশ আলতো করে মুছে আনতে হবে। এতে মুখে ফাঙ্গাস সংক্রমণের প্রবণতা কমবে। এছাড়া প্রতিবার দুধ খাওয়ানোর পর শিশুকে এক-দুই চামচ পানি পান করালে মুখ পরিষ্কার থাকবে। এই পানিটুকু দেয়ার জন্য ফিডারও ব্যবহার করা যেতে পারে।
গোসল
শিশুকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। তবে প্রথমদিকে দৈনিক গোসল না করালেও চলে যদি মলত্যাগ ও প্রস্রাবের পর শিশুকে ভালোভাবে পরিষ্কার রাখা যায়। শিশুকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রথম বছর এক দিন অন্তর গোসল করালেই চলে। গোসলের আগে যিনি গোসল করাবেন তার হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
গোসলের জন্য আগে থেকেই বাথটাবে হালকা উষ্ণ পানি তৈরি রাখতে হবে। সেই সাথে গোসলের পর শিশুর পরিধেয় বস্ত্রও রেডি রাখতে হবে। পানিতে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে নিতে হবে পানি কতটুকু উষ্ণ। শিশুকে কখনোই বেশি গরম বা ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করানো যাবে না। নাভি যাতে না ভেজে এই বিষয়টি মাথায় রেখে, প্রথম দুয়েক সপ্তাহ শরীর না ভিজিয়ে স্পঞ্জিং করে শরীর মুছে দেয়া উচিত।
গোসলের আগে শিশুর কাপড়-চোপড় খুলে, মল-মূত্র থাকলে তা পরিষ্কার করে তার পর শিশুকে বাথটাবে নামাতে হবে। গোসলের পানিতে কোনোরকম এন্টিসেপটিক সলিউশন মেশানো যাবে না। এ ধরনের সলিউশনে ত্বকে র্যাশ বা ফুসকুঁড়ি ওঠে। গোসলের জন্য নিউট্রাল পিএইচ জাতীয় সাবান ব্যবহার করা উচিত। শিশুর গোসলের সময় ত্বক কোমল কাপড় দিয়ে আলতো করে ঘষে দিতে হবে। গোসলের সময় প্রথমে মাথা ধুয়ে নিয়ে তার পর এক এক করে শরীর, গলা, মুখ ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে আনতে হবে। বসা অবস্থা শিশুর মাথায় পানি ঢালা যাবে না। এতে শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হবে।
নখ ও চুল কাটা
জন্মের পরই শিশুর চুল কাটার জন্য অনেকে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আসলে এই চুল কাটার কোনো দরকার নেই। অনেক শিশু জন্মের সময় লম্বা নখ নিয়ে জন্মায়। এই নখ দিয়ে নিজেই নিজের মুখে আঁচড় কেটে দাগ বসিয়ে ফেলে। এ অবস্থায় শিশুর হাতে মোজার মতো করে কাপড় পরিয়ে দেয়া যেতে পারে। আর নখ একটু শক্ত হলে তা কেটে দেয়া যেতে পারে। নখ কাটার জন্য শিশুর উপযোগী নেইল কাটার সংগ্রহ করতে হবে।
নাক পরিষ্কার করা
শিশুর নাকে অনেক সময় শ্লেষ্মা জমে। এই শ্লেষ্মার জন্য শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। শ্লেষ্মা শুষে আনার জন্য নাকের সাকার পাওয়া যায়। সাকার দিয়ে নাক পরিষ্কার করার পাশাপাশি নাকের দুই ছিদ্রতে দৈনিক দুই-তিন বার এক ফোঁটা করে নরদল স্যালাইন দেয়া যেতে পারে।
চোখ পরিষ্কার
অনেক নবজাতকের চোখে পিচুটি জমে। এজন্য নরসল স্যালাইন ভিজানো তুলো দিয়ে শিশুর চোখ মুছে দিতে হবে।
নবজাতকের যত্ন: কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশু প্রস্রাব পায়খানা না করলে।
- নবজাতকের জন্ডিস দেখা দিলে।
স্বাভাবিক কারণেই নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এই জন্ডিস কয়েকদিনের মধ্যেই কমে যায়। এ সময়ে শিশুকে প্রতিদিন কিছু সময় ধরে সকালের কচি রোদে রাখতে হবে। রোদে রাখার সময় মুখমণ্ডল রোদ থেকে আড়াল করে রাখলে শিশু স্বস্তিতে থাকবে।
- শিশু একেবারেই বুকের দুধ না পেলে
- শিশু যদি অতিরিক্ত ঘুমায় কিংবা কান্না করে
- নাভিতে ইনফেকশন হলে
- কোনো রকম জন্মগত ত্রুটি লক্ষ করলে
- শিশুর টিকাগুলো সম্পর্কে জেনে তা কার্যকর করার জন্য
- শিশুর চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়লে ও চোখে পিচুটি জমলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
- নবজাতকের জন্ডিস হলে।
নবজাতকের যত্ন যা মনে রাখতে হবে
- ঘরের বাইরে বেরুলে অবশ্যই শিশুর বিষয়ে অতি সাবধান থাকতে হবে
- শিশুর আশেপাশে ধূমপান করা ঠিক নয়।
- শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে
- নিয়মিত শিশুকে টিকাগুলো দিতে হবে
নবজাত শিশুটি স্বাভাবিক কী না?
সাধারণত গর্ভধারণের ৩৮-৪২ সপ্তাহের মধ্যে যে শিশু জন্ম নেয় তাকেই স্বাভাবিক পরিণত শিশু বলে ধরে নেয়া হয়।
নবজাতকের জন্মের পরপরই তাৎক্ষণিক পরিচর্যা কী?
জন্মের পর পরই শিশুর নাক ও মুখের মধ্যে জমে থাকা নিউকোনিয়াম নামক পিচ্ছিল তরল সাকশান (মেশিনের সাহায্যে আসে) দিয়ে বের করে নিতে হবে। এতে শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসে সুবিধা হবে। শিশুকে পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত সুতি উ কাপড় দিয়ে জড়িয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রার রুমে রাখতে হবে। হাসপাতালে শিশু জন্য নিলে শিশুচিকিৎসক শিশুর কোনো অনুগত ত্রুটি না তা পরীক্ষা করে দেখেন।