আমরা প্রায় প্রত্যেকেই জানি কলেরা একটি ভয়ঙ্কর ও প্রাণঘাতী রোগ। যথা সময়ে সঠিক চিকিৎসা না হলে এই রোগে প্রায় মড়ক লেগে যায়। সংক্রামক এই রোগটি হলে বমি ও পায়খানা একসঙ্গে শুরু হয়ে যায়। সাধারণতঃ কলেরা মাছির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। বমি ও পায়খানার সঙ্গে পিণ্ডলিতে আড়ষ্ট ভাব, পিপাসা, মূত্রাবরোধ শরীরে লবণের অভাব ইত্যাদি লক্ষণও দেখা যায়। প্রথম দিকে হলুদ হলুদ পাতলা দাস্ত হয় তারপরই ভাতের মাড়ের মতো পাতলা অনবরত দাস্ত হতে থাকে। বমির সময় প্রথমে পাকাশয়ে জনে থাকা খাবার বেরোতে শুরু করে তারপরে পাতলা জলের মতো তরল বেরোতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা না হচ্ছে। রোগীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে।

কলেরা হওয়ার কারণ
সাধারণতঃ যাঁরা পেট ভর্তি করে পরিমাণের বেশী খান, তারাই রোগের শিকার হয়ে পড়েন। এছাড়া নোংরা জল পান, পচা-গলা বাসি খাওয়া, পার মাছ সেবন, গুরুপাক তৈলাক্ত আহার অত্যধিক সেবন করলে কলেরা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে আহারজনিত কলেরা জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত কলেরার ক্ষেত্রে প্রায় গ্রামের পর গ্রাম মড়ক লেগে যায়। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব এই রোগের প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হয়। এছাড়া শুরু কলেরাও হয়। এতে লক্ষণগুলো সবই হয় কলেরার মতো, কিন্তু বমি বা দাস্ত হয় না। এটাও কম বিপজ্জনক নয়।
কলেরা রোগের লক্ষণ
কলেরা রোগের শুরুতে রোগীর হাত-পায়ের আঙুলে ভীষণ ব্যথা হয় আড়ষ্ট ভাব লক্ষ্য করা যায়, আর তার পরেই পিগুলি, জঙ্ঘা, অস্ত্র এবং মাংসপেসীতে অস্বস্তি হতে শুরু করে। হাত-পায়ের আঙুল নীল হয়ে যায়। ত্বক বা চামড়া জড়-জড় হয়ে যেতে থাকে, প্রস্রাব কম হতে থাকে, গাঢ় হলুদ প্রস্রাব হয় পাকস্থলীতে জ্বালা করে, ব্যথা হয়, টিপলে কষ্ট হয়, জিভ সাদা হয়ে যায়। মুখের স্বাদ তেতো তেতো লাগে, অত্যধিক তৃষ্ণা পায়। অথচ জল খেলেই বমি ও দাস্ত হয়ে যায়। রোগের বাড়াবাড়ি অবস্থায় জলের মতো বা ভাতের মাড়ের মতো দাস্ত হয়, তবে তখন আর ব্যথা থাকে না, সেই সঙ্গে বমিও হয়। এসময়ে রোগীকে অজ্ঞান হয়ে পড়তেও দেখা যায়।
কলেরা রোগীর ঘরোয়া চিকিৎসা
(1) 5 গ্রাম হিং, 10 গ্রাম কর্পূর, 10 গ্রাম খয়ের এবং নিমের 10 টি নরম বা কোমল (অর্থাৎ কচি) পাতা নিয়ে তুলসীর রসে মেড়ে মটরের ডানার মতো ছোট ছোট গুলি তৈরি করে নিতে হবে। দিনে 3-4 বার একটি করে গুলি গোলাপের আরকের সঙ্গে সেবন করতে দিলে কলেরা রোগে উপকার হয়।
(2) 10 গ্রাম জায়ফল চূর্ণ গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে এক-একটা তিন গ্রামের গুলি তৈরি করে নিন। এই রকম একটি করে গুলি আধঘণ্টা অন্তর খেয়ে হালকা গরম জল সেবন করলে কলেরার পায়খানা বন্ধ হয়ে যায়।
(3) কলেরার প্রকোপ দেখা গেলেই মাঝে মধ্যেই খানিকটা করে পেঁয়াজের রস সেবন করতে দিলেও আরাম পাওয়া যায়। কলেরার গোড়াতেই । রতি পরিমাণ হিং মিশ্রিত পেঁয়াজের রস আধ ঘণ্টা অন্তর দিলে কলেরা রোগে উপকার হয়।
(4) আজমোদের পাতা ভালো করে ধুয়ে নিয়ে পিষে তার রস বের করে নিন। এই রস কলেরা হলে এক ঘণ্টা অন্তর সেবন করতে দিন। প্রথমে বড় চামচের চার চামচ করে দিন। পরে পায়খানা ধরে না আসা পর্যন্ত বা মল একটু ঘন হয়ে না আসা পর্যন্ত দু’ চামচ করে দিয়ে যেতে হবে। এতে খুব অল্প সময়ে কলেরা প্রশমিত হয়ে আসে।
(5) 10 রতি গোলমরিচ, ঘিয়ে ভাজা 10 রতি হিং এবং ৪ রতি আফিম এক সঙ্গে মিশিয়ে 12 টি গুলি তৈরি করে নিন। দিনে 3-4 বার একটি করে গুলি সেবন করতে দিন। এতেও কলেরা রোগ নিয়ন্ত্রিত হয়।
(6) 100 গ্রাম তেলে একটা জায়ফলের চূর্ণ দিয়ে অল্প আঁচে ভেজে নিন। ভালো করে পাক হলে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে রোগীর হাতে ও পায়ে মালিশ করুন। এতে রোগীর হাত-পায়ের ব্যথা দূর হবে।
(7) চিনি বা বাতাসার মধ্যে 2-3 ফোঁটা লবঙ্গের তেল মিশিয়ে সেবন করতে দিন। এতেও কলেরাতে উপকার পাওয়া যায়।
কলেরা রোগীর পথ্য
কলেরার হাত থেকে বাঁচতে অথবা নিয়ন্ত্রণে রাখতে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন রোগী অজ্ঞান না হয়। গরম ও টাটকা খাবার খেতে দেবেন। ভালো মতো খিদে পেলে তবেই খেতে দিবেন। খাবারের সঙ্গে অবশ্যই পুদিনা, পেঁয়াজ, পুরনো পাকা তেঁতুল, কাগজি লেবুর রস সেবন করতে হবে। বাড়িতে কুয়ো থাকলে তাতে পটাশিয়াম দিতে পরামর্শ দিন। নোংরা বাজারি খাবার, আ-ঢাকা খাবার, জাগরণ ইত্যাদি থেকে সাবধান থাকতে হবে।
কলেরা প্রতিরোধে যা করতে হবে
- পানি ও খাবারের মাধ্যমে কলেরা ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে পথেঘাটে উন্মুক্ত হোটেল-রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য অনিরাপদ উৎস থেকে পানি ও খাবার খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে।
- নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস চালু রাখতে হবে। বিভিন্ন রোগজীবাণুর আক্রমণ থেকে শরীরকে মুক্ত রাখার জন্য সবচেয়ে ‘কার্যকর টিকা’ হচ্ছে নিয়মিত হাত ধোয়া।
- ঘিঞ্জি, নোংরা পরিবেশে, যেখানে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা নিম্নমানের, সেখানে কলেরার প্রকোপ বেশি। তাই বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। উন্নত পয়োনিষ্কাশন নিশ্চিত করতে হবে।
কলেরার টিকা
- পোলিও টিকার মতো কলেরার টিকা মুখে খেতে হয়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুই ডোজের টিকা খেলে তা কলেরার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে প্রতিরোধ গড়ার হার গড়ে ৮৫ শতাংশ। টিকা খাওয়ার প্রথম ছয় মাসে এটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর থাকে। এরপর কার্যকারিতা কিছুটা হ্রাস পায়।
- বলা হয়ে থাকে, টিকা দুই-তিন বছর পর্যন্ত কলেরার বিরুদ্ধে প্রতিরোধদেয়াল গড়ে তুলতে সক্ষম। যাঁরা কলেরাপ্রবণ এলাকায় যাবেন, তাঁদের জন্য এক ডোজ টিকার ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্বের কোথাও কোথাও এটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- টিকা নেওয়ার পর সাময়িক সময়ের জন্য পেটে হালকা ব্যথা হতে পারে। হতে পারে পাতলা পায়খানাও।
- ক্ষুধামান্দ্য, জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি অনুভব, বমি ইত্যাদিও দেখা দিতে পারে।
জেনে রাখুন
- কলেরার টিকা গর্ভবতী মায়েদের জন্যও নিরাপদ। এমনকি যাঁদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের ক্ষেত্রেও এটি নিরাপদ। বিশ্বের ৬০টি দেশে এই টিকার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। টিকা কলেরার মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমাতে সক্ষম।
- তবে কোনো টিকাই শতভাগ রোগ প্রতিরোধে সক্ষম নয়। এ কারণে কলেরা প্রতিরোধের জন্য নিরাপদ পানি ও খাবারের দিকে নজর রাখতে হবে।
রোগীর মল-মূত্র ও বমি মাটিতে গর্ত করে পুঁতে দিন। জল ফুটিয়ে খেতে হবে।